A+ A-

আমার ঝাড়গ্রাম (১ম পর্ব)

নতুন জেলা হচ্ছে ঝাড়গ্রাম। চাকরি জীবনের সেরা দেড় বছর কাটিয়েছি জঙ্গলমহলের শহরে। লেকচারার, ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজ, জুলাই ১৯৯৬ থেকে ডিসেম্বর ১৯৯৭। প্রথম কলকাতা ছেড়ে একা বাইরে চাকরি করতে যাওয়া। কিন্তু একাকিত্ব গ্রাস করেনি কোনওদিন। যৌথ জীবনের এক আশ্চর্য পাঠ মিলেছিল ঝাড়গ্রামের বাসিন্দাদের কাছ থেকে। যেমন শান্ত স্নিগ্ধ সবুজ শহর, তেমন অমায়িক মানুষজন। দুটি বাড়িতে ভাড়া ছিলাম। কী অপার মায়ায় সকলে আপন করে নিয়েছিলেন। ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিত আসত গল্প করতে, খোঁজ-খবর নিতে। ভালোমন্দ রান্না হলে তাদের বাড়ি ডেকে নিয়ে গিয়ে খাওয়াত। বাইকের পিছনে বসিয়ে নিয়ে যেত ছাতা পরব দেখাতে। আড্ডা হত হোতা পরিবারের বাড়িতে। এই পরিবারের দিব্যেন্দু হোতা শিক্ষা বিভাগের উচ্চপদে ছিলেন। ওই বাড়ির মেয়ে সুরচিতা যাদবপুরে আমার দু’ক্লাস নিচে পড়ত। একদম নিজের বাড়ির মতো মনে হত ওদের বাড়িটা। প্রথমদিকে খাবার আসত বাসস্ট্যান্ডের সারদা হোটেল থেকে। অসম্ভব সম্মান করতেন হোটেলের কর্মীরা। ছিমছাম নামে মিষ্টির দোকান, বাজারের উলটোদিকে অশোকা হোটেল — এদের কর্মীরাও ভালোবাসতেন। মাঝে মাঝে ক্লাসের চাপ থাকলে কলেজের উলটোদিকে বাবলুর দোকানে খেতাম। বাঁশপাতার মতো পাতলা মাছের টুকরো ভাসত ঝোলের মধ্যে। বাবলুর অমায়িক ব্যবহার ক্ষতিপূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল। আজ যে বিখ্যাত কলেজ প্রিন্সিপ্যাল মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, সে সেদিন ছিল সোমনাথ। মানিকপাড়া কলেজে পড়াত। শালবীথি লজে থাকত। কত গল্প হত ফেলো যাদবপুরিয়ান হিসাবে। ঝাড়গ্রাম যেতাম ইস্পাত এক্সপ্রেসে, ফিরতাম সাধারণত কুরলা-হাওড়া এক্সপ্রেসে। ট্রেনযাত্রার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা আজও টাটকা ছবির মতো। তার একটি নিয়ে লিখেছি জীবনের প্রথম ছোটোগল্প ‘পুরুষতন্ত্র’। সানন্দায় প্রকাশিত। সব মিলিয়ে ঝাড়গ্রাম আমার মানুষ দেখার, আপন-পর চেনার বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ।

ঝাড়গ্রাম থেকে যেদিন বাড়ি ফিরতাম, দুপুর পর্যন্ত ক্লাস করে কুরলা-হাওড়া এক্সপ্রেস ধরতাম। এখন কুরলার নাম হয়েছে লোকমান্য তিলক টার্মিনাস। ট্রেনটি আজও আছে, হাওড়ার বদলে শালিমার থেকে যাতায়াত করে। যাই হোক, এই ট্রেন ঝাড়গ্রামে অবধারিত ২-৩ ঘণ্টা লেট আসত। একবার তো নির্ধারিত সময়ের আধঘণ্টা আগে ট্রেন এসে গেল। বিরল ঘটনায় অবাক হয়ে ট্রেনে চড়তে গিয়ে জানা গেল, আগের দিনের ট্রেন, প্রায় ২৪ ঘণ্টা লেট। আর একবার, আমার ছেলে জন্মানোর দিন সমাগত, ৭ দিনের ছুটি নিয়ে কলকাতা ফেরার জন্য স্টেশনে গিয়ে শুনি সেদিন আর কোনও ট্রেন আসবে না। রাখা মাইনস্‌-এর কাছে ওভারহেড তার ছিঁড়ে গিয়েছে। বাড়িতে ফোন ছিল না যে খবর দেব। বিনিদ্র রাত কাটালাম ভাড়াবাড়িতে। বাড়িওয়ালা নিজেদের ঘরে ডেকে নিলেন। রাতে খাওয়ালেন। বললেন, “কথায় গল্পে থাকুন, তাহলে দুশ্চিন্তা কম হবে। ভোরবেলা স্টিল এক্সপ্রেস ধরে ফিরে যাবেন।” ভোরে তিনিই বাইক চালিয়ে স্টেশনে পৌঁছে দিলেন।
কুরলা এক্সপ্রেস অস্বাভাবিক লেট চললে চাতকের মতো স্টেশনে বসে থাকতাম। কতদিন মন খারাপ করিয়ে নাকের ডগা দিয়ে পরের ট্রেন ডাউন গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস ঝাড়গ্রামে না থেমে চলে যেত। একজন স্টেশন মাস্টার চেনা হয়ে গিয়েছিলেন। কুরলা এক্সপ্রেস লেট শুনলেই তাঁর কাছে গিয়ে তরুণ শিক্ষকরা মিলে বায়না করতাম, একটিবার গীতাঞ্জলি থামিয়ে দেবার জন্য। চড়ার বড়ো শখ। তিনি বলতেন, “উপায় নেই। চাকরি চলে যাবে।”
কিন্তু একদিন তিনি কথা রেখেছিলেন। নিজেই আমাদের ডেকে খবর দিলেন, “ডাউন কুরলা ৬ ঘণ্টা লেট। আজ এক মিনিট আপনাদের জন্যই গীতাঞ্জলি দু’নম্বর প্লাটফর্মে থামবে। পিছনের সেকেন্ড ক্লাসে উঠবেন। এত শর্ট ডিসট্যান্সে জার্নি করার নিয়ম নেই ওই ট্রেনে। কিন্তু আমি টিটিই-কে বলে রেখেছি। পারলে ট্রেন এলে আমিও আসছি।”
ট্রেনের খবর হতে মহা মজায় আমরা পোজিশন নিলাম। গীতাঞ্জলি এল। হইহই করে নির্দিষ্ট কামরায় উঠে পড়লাম। বাইরে স্টেশন মাস্টারকে দ্রুতপায়ে আসতে দেখা গেল। সবাই মুখ বাড়িয়ে তাঁকে ধন্যবাদ দিতে গেলাম। তিনি অভিবাদন গ্রহণ করে সহাস্যে জানালেন যে, আর দেখা হবে না। তিনি কালই চাকরি থেকে অবসর নিচ্ছেন।
অমনি ট্রেন নড়ে উঠল। আমরা কিছু বলার আগেই গতি বাড়িয়ে ঝাড়গ্রাম স্টেশন ছেড়ে গেল। হাওড়া পর্যন্ত তিনঘণ্টার আনন্দযাত্রায় কোথায় যেন বিষাদের সুর জড়িয়ে রইল।
মানুষটির সঙ্গে সত্যি পরে আর দেখা হয়নি। বিশ্বাস করেছিলাম, কয়েকজন সাধারণ যাত্রীর বিচিত্র আবদার পূরণ করার ক্ষমতা একমাত্র ঝাড়গ্রামের স্টেশন মাস্টারই রাখেন। এই সব অভিজ্ঞতার জন্যই বলি, ঝাড়গ্রাম আমার মানুষ দেখার, আপন-পর চেনার বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ।

রাজ কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের কথা না বললে ঝাড়গ্রাম প্রবাসের গল্প সম্পূর্ণ হবে না। প্রথমদিন থেকে তারা যে কী মায়ায় আপন করে নিয়েছিল, বলার নয়। জীবনে প্রথম কলকাতার বাড়ি ছেড়ে বাইরে থাকা। একা বসবাসের চালচুলো জানা নেই। ভাড়াবাড়িতে তক্তপোশ দিয়েছিল। তার ওপরে বেডশিট পেতে সাধু-সন্তদের মতো ঘুমাতাম। দুই ছাত্র কৌতূহলে এক বিকেলে আমার বাসগৃহ দেখতে এল। চোখে-চোখে কী যেন কথা বলল আর আমাকে বলল, “স্যর একটু আসছি।” একঘণ্টা পরে এসে সিঙাড়া মিষ্টি খেয়ে গেল। পরদিন বিকেলে দুই মক্কেল আবার রিকশ চড়ে হাজির। বলে, “৪২০ টাকা দিন।”
“কেন, চাঁদা নাকি?”
ওরা কথা না বাড়িয়ে রিকশ থেকে একটা তোষক নামিয়ে আনল। আমার তক্তায় পরিপাটি করে পেতে দিতে দিতে জানাল, তোষকের দাম ৪০০ টাকা ও রিকশ ভাড়া ২০ টাকা।
ইতিহাস অনার্স ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা আমায় আপনজনের মতো আগলে রাখত। একজন ব্যতিক্রম। কানাঘুষো শুনলাম, সে নাকি আমাকে পছন্দ করে না। একদিন একা পেয়ে বেচারিকে ধরলাম, “হ্যাঁ লখিন্দর, আমি কি ঠিক শুনছি, তুমি নাকি আমাকে পছন্দ করো না?”
“না স্যর, তা নয়।”
“তাহলে।”
“সকলে এমন আপনাকে ঘিরে থাকে যে, মনে হয় আপনি একমাত্র আমাকেই পছন্দ করেন না।”
কী উত্তর দেব ভেবে পাই না। এমন সরল হবার শিক্ষা নিজেই পেয়ে উঠিনি যে!

তখন ঝাড়গ্রামে রাজনৈতিক ঝামেলা লেগেই থাকত। কথায় কথায় খুন বা খুনের চেষ্টা। রাতে মাইকে ঘোষণা হয়ে গেল, পরদিন সকাল থেকে সর্বাত্মক বনধ। পালাবার পথ নেই। প্রথমদিকে খুব দুশ্চিন্তা হত, কাল খাব কি? সারদা হোটেল কী অশোকা হোটেল খুলবেই না। কিন্তু দুদিনেই জেনে গেলাম, বনধ মানে আমার মহাভোজের দিন। সকাল হতেই দু-একজন ছাত্র সাইকেল চালিয়ে এসে জেনে যেত আছি কিনা। তারপর দুপুরে আবার আসত পাঁচবাটির টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে। তাদের দলনেতা ছিল প্রকাশ। দেড় বছরে প্রকাশের বাড়ি আমার নিজের বাড়ি হয়ে গিয়েছিল।

তখন রাজ কলেজে চাকরির এক বছর অতিক্রান্ত। গরমের ছুটিতে গোলপার্ক অঞ্চলে মারুতি ৮০০ গাড়ির মৃদু ধাক্কা খেয়ে শয্যা নিলাম। এক্সরে করে দেখা গেল হাড় ভাঙেনি। কিন্তু মাসলে প্রভূত টেনশন। লিগামেন্ট জখম। ডাক্তার বেডরেস্ট লিখে দিলেন। ১২-১৩ দিন পর অনেকটা সুস্থ, এক দুপুরে চারজন ছাত্র ও দুই ছাত্রী বাড়ি খুঁজে উপস্থিত। দুর্ঘটনার খবর পেতে দেরি হয়েছে। তারপর ক’দিন লেগেছে কলকাতার ঠিকানা যোগাড় করতে। ভোরের স্টিল এক্সপ্রেস ধরে দেখতে এসেছে। বিকেলে আবার ওই ট্রেনেই ঝাড়গ্রাম ফিরে যাবে। এত ভালোবাসা পেয়েও মাত্র দেড় বছরের মাথায় কেরিয়ারের তাগিদে তাদের স্বার্থপরের মতো চিরতরে ছেড়ে এসেছি। শহুরে শ্লাঘা সরিয়ে রেখে আজ শুধু এইটুকু স্বীকার করি, ঝাড়গ্রাম আমার মানুষ দেখার, আপন-পর চেনার বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ।

ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে ১৯৯৬ সালে পড়াতে যাবার কালে বাড়িতে ফোন ছিল না। মোবাইল ওঠেনি। ল্যান্ডফোনের জন্য আবেদন করেছি, আসতে বছর ঘুরবে। সকলের খোঁজ নেব কী করে? নতুন বিয়ে করেছি, মা-বাবা বয়স্ক। কথাপ্রসঙ্গে পাড়ার প্রিয় বন্ধুকে বললাম। শুনেই বলল, “আমার বাড়িতে ফোন আছে। বউকে বলে দে, একদিন অন্তর নির্দিষ্ট সময়ে এসে বসে থাকতে। তখন কথা বলে নিস।”
খুশি হলাম, এই নাহলে বন্ধু।
ঝাড়গ্রামে ভাড়াবাড়ির কাছেই ফোন বুথ। ওরা আমার জন্য সপ্তাহে তিনদিন রাত ন’টার স্লট খালি রেখে দিতেন।
এমন চলল একমাসের বেশি। দু’দিনের জন্য বাড়ি ফিরতে বউ বলল, “আর তোমার বন্ধুর বাড়ি গিয়ে ফোনের পাশে বসে থাকতে পারব না।”
“রাতে বেরোতে অসুবিধা হয়?”
“ওদের বাড়ি গিয়ে বসে থাকার ফলে ওরা বিরক্ত হচ্ছে। মুখে বলে না, হাবভাবে বুঝিয়ে দেয়।”
“তাহলে উপায়? কাল গিয়ে একবার কথা বলব?”
“সামান্য ব্যাপার, তোমার বন্ধুকে কিছু বলার দরকার নেই। একটা ব্যবস্থা ভেবেছি, দরকারি খবর থাকলে দিনের যে কোনও সময় গিয়ে ওদের জানিয়ে আসব। তুমি একদিন অন্তর ফোন করে নিও। যদি কোনও খবর না থাকে, সেদিন যাব না।”
আশ্বস্ত হয়ে ঝাড়গ্রাম ফিরে যাই। নতুন ব্যবস্থা দু’মাস চলল। তারপর বুঝতে পারলাম, সুর কাটছে। বন্ধু ও তার বাড়ির লোক আমার ফোন ধরতে অনিচ্ছুক, হয়তো বিরক্ত। মাসের শেষে দু’দিনের জন্য কলকাতা ফিরতে বউও এক কথা বলল।
পরদিন সকালে বাজারে বন্ধুর সঙ্গে দেখা, মুখ ঘুরিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। কয়েকদিনের মধ্যে বাড়িতে ফোন এসে গেল। কিন্তু বন্ধু এড়িয়ে চলতেই লাগল।

দেড়বছর ঝাড়গ্রামে কাটিয়ে বিশ্বভারতীতে এলাম। স্থান ও কাল বদলে গিয়েছে, রুটিন বদলায়নি। একদিন কলকাতা গিয়েছি, সেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা। দাঁড়াতে বাধ্য করল। ভাবলাম, এতদিনে ভুল বুঝতে পেরেছে। গায়ে পড়ে অনেক কথা বলতে থাকে। বেশিরভাগ অপ্রাসঙ্গিক। মোবাইল নম্বর চাইল। দিলাম। বন্ধু তার নম্বর দিল না।
কর্মস্থলে ফেরার দিনসাতেক পরে অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। সেই বন্ধু। সাতপাঁচ কথায় আন্তরিক হবার চেষ্টা। মনে হচ্ছিল, বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ফোন করেছে। বলার সুযোগ খুঁজছে। দু-চার কথার পর আসল কথাটি বলল, “আমার এক নিকট বন্ধুর ছেলে তোর ইউনিভার্সিটিতে অমুক ডিপার্টমেন্টের তমুক কোর্সে অ্যাপ্লিকেশন করেছে। আগামি সপ্তাহে আডমিশন টেস্ট। তারপর মেরিট লিস্ট। চান্স পাইয়ে দিতেই হবে, প্রেস্টিজের প্রশ্ন। আমার বন্ধুর নাম গোপাল। তোর নম্বর দিয়েছি, কল করলে ধরিস।”
তারপর এবেলা-ওবেলা গোপালের ফোন আসতে লাগল একই অনুরোধ নিয়ে। ব্যাপারটা চলতে থাকল মেরিট লিস্ট প্রকাশিত হওয়া ও গোপালের ছেলের নাম না-থাকা পর্যন্ত। বললাম, “আগেই বলেছি, সিলেকশন নিয়ে কিছু করার নেই, এখানে সব নিয়মে বাঁধা।”
কিছুক্ষণ পর ক্লাসে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছি, বন্ধুর ফোন এল। বললাম, “ক্লাস থেকে ফিরে রিং ব্যাক করি?”
“না তোকে এক্ষুণি শুনতে হবে।”
“বল কী বলবি।”
“এত রিকোয়েস্ট করলাম, গোপালের ছেলেটার আডমিশন করিয়ে দে, প্রেস্টিজ ইস্যু, কিছু করলি না?”
“প্রথম দিনেই বলেছি, এখানে ব্যাকডোর দিয়ে কিছু হয় না। তাহলে এই প্রশ্ন উঠছে কেন?”
ব্যস, আগুনে ঘি পড়ল! শৈশবের প্রিয় বন্ধু বাছাই করা চোস্ত গালাগালিতে কান ভরিয়ে দিতে লাগল। শেষে বলল, “তোর মতো মানুষের মুখদর্শন করা উচিত নয়।” ফোন কেটে দিল। কুড়ি বছরের একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। এই জন্যই বিশ্বাস করি, ঝাড়গ্রাম আমার মানুষ দেখার, আপন-পর চেনার বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ।

ঝাড়গ্রামে ডাউন কুরলা-হাওড়া এক্সপ্রেস ঢুকতে নিয়মিত লেট করত আগেই লিখেছি। যেদিন বেশি লেট থাকত, বাসে খড়গপুর স্টেশন যেতাম লোকাল ট্রেন ধরে বাড়ি ফেরার জন্য। সরাসরি বাস হোক বা ভায়া মানিকপাড়া, খুব ভিড় হত। কিন্তু অধিকাংশ দিন বাসে উঠলেই কেউ না কেউ জায়গা ছেড়ে দিতেন। কলেজের শিক্ষককে চিনতে পেরে এমনকী আমার চেয়ে বেশি বয়সি অনেকেই। সে এক মহা বিড়ম্বনা। মুখে এককথা, “যার যা প্রাপ্য সম্মান, তাকে তা দিতেই হবে। এটাই মানবধর্ম।”
একটা বিপরীত ঘটনা মনে পড়লে আরও অপ্রস্তুত হতাম। বন্ধু গল্প করেছিল, সে একবার ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেসে বসে আসানসোল থেকে হাওড়া আসছে। দুর্গাপুর থেকে তার পিসেমশাই উঠলেন। তাকে দেখেই চিনলেন ও সামনে এসে কথা বলতে শুরু করলেন। বন্ধু না-চেনার ভান করে জানালার বাইরে চেয়ে রইল। তারপর একসময় ঘুমের ভান করে পড়ে রইল লিলুয়া পর্যন্ত। ক’দিন পর বাড়িতে জানাজানি হতে বাবা খুব বকলেন। তার উত্তর, “ওই ভিড় ট্রেনে কষ্ট করে পাওয়া সিট গুরুজনকে ছেড়ে দেব এমন বোকা আমি নই।”
যাই হোক, খড়গপুরের বাসে সবদিন সিট মিলত এমন নয়। সেই সময় একটা অভিনব অভ্যাস রপ্ত করেছিলাম প্রবল ভিড়ের চাপ থেকে বাঁচতে। দাঁড়ানো অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়তাম। নড়াচড়ার জায়গা নেই, অতএব শরীরের ভারসাম্য রাখার দরকার নেই। কিন্তু গোল বাধত বাস খড়গপুরের গিরি ময়দান স্টেশনের স্টপেজে পৌঁছলে। অনেক লোক মেদিনীপুর লোকাল ধরতে নেমে যেত বাস খালি করে আর তখনই আমি ধড়াম করে পড়ে যেতাম। একদিন পড়ে যেতে যেতে অনুভব করি কে যেন আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। চোখ খুলে দেখি একজন বয়স্ক মানুষ। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আলাপ করি। স্থানীয় এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গে পরিচয় আরও গাঢ় হয়। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান দুর্ঘটনায় মারা যাবার পর বাড়িতে থাকতেন না। খড়গপুরে একটা অনাথাশ্রমে থাকতেন ও স্বেচ্ছাশ্রম দিতেন। মাইনের টাকা সেখানেই দিয়ে দিতেন। আমাকে নিয়ে যাবেন বলেছিলেন। কথা দিলাম, যাব একদিন। চাকরি ছেড়ে চলে আসায় কথা রাখা হয়নি।
এর কয়েকবছর পর তিনি অনাথ ছেলেদের একটা দলকে শান্তিনিকেতন ঘোরাতে নিয়ে আসেন। খুঁজে খুঁজে ঠিক আমার সঙ্গে দেখা করেন ও বাচ্চাদের সঙ্গে পরিচয় করান। লজ্জিত হয়ে পুরনো কথা তুলি। তিনি বলেন, “কথা দেওয়া মানে কথা নেওয়াও। দাতা ও গ্রহীতার কেউ একজন কথা রাখলেই হল।”
এই জন্যই বলি, ঝাড়গ্রাম আমার মানুষ দেখার, আপন-পর চেনার বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ।

দেশভাগের সময় ওপার বাংলা থেকে একটি পরিবার ঝাড়গ্রামে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়েছিল। সেই বাড়ির এক বধূ রেললাইনের ওপারে বাছুরডোবা অঞ্চল থেকে আমার ভাড়াবাড়িতে কাজ করতে আসত। বউদি বলে ডাকতাম। কিছুদিন কাজ করার পর একদিন এগারো-বারো বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এল। বউদির মেয়ে আনন্দী। অসাধারণ সপ্রতিভ আর এমন অনুসন্ধিৎসু চোখ খুব কম কিশোরীর হয়। বউদি বলল, তার মেয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ে। বাড়ির অন্য সকলের সঙ্গে বসে আগরবাতি অর্থাৎ ধুপ বানায়, যা বিক্রির জন্য বিভিন্ন দোকানে পাঠানো হয়। বউদি যদি কোনওদিন কাজে কামাই করে, তবে আনন্দী বাবার সঙ্গে এসে কাজ করে দিয়ে যাবে। বউদির আর্জি, আনন্দীর পড়া আটকে গেলে আমি যেন একটু সময় করে বুঝিয়ে দিই। বললাম যে, ওইটুকু মেয়েকে কাজ করে দিতে হবে না। বউদি কাজে না এলে জানিয়ে দিলেই হবে। সেদিনের মতো কাজ আমিই করে নিতে পারব। কিন্তু আনন্দী যেন তার পড়াশুনার দরকারে যে কোনওদিন বিকেলে চলে আসে।
কয়েকদিন পর থেকে আনন্দী পড়া নিয়ে আমার কাছে আসতে লাগল। ক্রমশ তার আসা বেড়ে গেল। প্রায় প্রতিদিন বিকেলে আনন্দী আমার বাড়িতে আসত। আবিষ্কার করলাম, মেয়েটি প্রতিভাধর। পড়াশুনার বাইরে অন্যরকম অনেক ভাবনাচিন্তা লালন করে, যা এইরকম সামাজিক অবস্থানের একটি কিশোরীর কাছ থেকে সচরাচর আশা করা যায় না। আনন্দী কাগজ ছিঁড়ে অভিনব কোলাজ বানাত। কেউ শেখায়নি, সবটাই নিজের সহজাত ধারণা থেকে। আমি ওর জন্য রঙিন মার্বেল পেপার কিনে আনতে শুরু করলাম। ফলে কোলাজ বানানোর উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। দ্বিতীয় যে শখ বা গুণ ছিল আনন্দীর, তা বিরলের মধ্যে বিরলতম। ও বিকেলবেলায় আমার পড়ে ফেলা খবরের কাগজটি নিয়ে বসত। সেখানে যত মানুষের ছবি প্রকাশিত হত তাদের সম্পর্কে খবরগুলি পড়ে কিছু তথ্য পেত এবং বাকিটা আমার কাছে জানতে চাইত। রাজনৈতিক থেকে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ফিল্মস্টার থেকে খেলোয়াড়, সকলের প্রতি আনন্দীর সমান আকর্ষণ। একটি খাতায় যত্ন করে নাম লিখে নিচে তাদের বিষয়ে নানা তথ্য লিখে রাখত। পরদিন বা অন্য কোনওদিনের কাগজে বা আমার কাছ থেকে বাড়তি তথ্য পাওয়া ও সংযুক্ত করার আশায় একটি-দুটি পাতা ছেড়ে নতুন লোকের নাম লিখত।
মেয়েটির বিরল কাজের শরিক হয়ে ঝাড়গ্রামে প্রায় দেড়বছর কাটিয়ে ছিলাম। ততদিনে আনন্দী কৃতিত্বের সঙ্গে অ্যানুয়াল পরীক্ষায় পাশ করে সেভেনে উঠেছে। বউদি বলত, “আমার একটাই স্বপ্ন, মেয়েটা যেন মানুষ হয়। চাইব ও পরিশ্রম করে জীবন চালাক, কিন্তু কারও বাড়িতে কাজ করে নয়।”
চলে আসার আগে আনন্দিকে অনেক উপহার দিলাম। বললাম, “মাঝে মাঝে চিঠি লিখিস।”
ও বলল, “লিখব না। চিঠি লিখতে ভালো লাগে না। আমার কথা মনে পড়লে এসে দেখে যেও।”
১৯৯৭-এর পর ঝাড়গ্রাম যাইনি। দৃঢ় বিশ্বাস, আনন্দীর মতো মেয়ে জীবনে সফল না হয়ে পারে না। বরং আমি কী পেয়েছি দেখা যাক; ঝাড়গ্রাম আমার মানুষ দেখার, আপন-পর চেনার বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ।


‘আমার ঝাড়গ্রাম’ লেখাটি সাহিত্যিক ও ভ্রমণপিপাসু অরুণাভ দাস তাঁর ফেসবুক ওয়ালে বারোটি খণ্ডে পোস্ট করেছিলেন। পাইনকোন-এর অনুরোধে তিনি লেখাটি এই সাইটে প্রকাশ করতে অনুমতি দিয়েছেন। এই পর্বে রইল লেখাটির প্রথম ছ’খণ্ড। পরের পর্বে থাকবে শেষ ছ’টি খণ্ড।

অরুণাভ দাস

অরুণাভ দাসের জন্ম ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে, কলকাতায়। কর্মজীবন শুরু ১৯৯২-এ ভ্রমণ পত্রিকার সাব এডিটর হিসাবে। ১৯৯৬-৯৭ ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে লেকচারার। ১৯৯৭ থেকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় শানিনিকেতনে অধ্যাপনা। ভ্রমণ বিষয়ে কয়েক হাজার ফিচার লিখেছেন এপার ও ওপার বাংলার নানা পত্রপত্রিকায়। ছোটোগল্প প্রকাশিত দেশ, সানন্দা, বর্তমান, সাপ্তাহিক বর্তমান, শুকতারা ইত্যাদি পত্রিকায়। উপন্যাস, ভ্রমণকথা, ইতিহাস মিলিয়ে প্রকাশিত বই ২৮টি। ভ্রমণ আড্ডা থেকে ভ্রমণসম্মান ২০১৪ ও সিকিম এক্সপ্রেস সংবাদপত্র থেকে ট্রাভেল রাইটার অব দ্য ইয়ার ২০১৬ সম্মানপ্রাপ্ত।

Read Next: সাঁওতাল শব্দের অর্থ অনুসন্ধানে

Join the Discussion

Your email address will not be published. Required fields are marked *