এভাবেই রাস্তা থেকে সে বেপাত্তা হয়ে গেল।
এসব যদিও পুরোনো প্ল্যান সব। দিদা বলত একলষেঁড়ে, যখন-তখন পিঁপড়েদের সাথে সারাদুপুর ছাদে পড়ে থাকত; জলে ছেড়ে দিত পা-টা ছিঁড়ে। আসলে ভাই-বেরাদর বিশেষ একটা ছিল না তো, তাই।
এমনকী পোষা-পুষিও বারণ ছিল। বাবার ঠাকুমা কবে বলে গেছিলেন, জন্তু-জানোয়ার না পোষার ব্যাপারে। মামারা যখন সেই কুকুর পোষা ধরল। ডালমেশিয়ান। আহ! সে কী চিকনাই লোম! নরম-নরম গা। কুঁইকুঁই করছে। কালো চাকা-চাকা দাগগুলো তো ফোটেনি তখনও ভালো করে। ওদের বাড়িতেই মামা প্রথম আনে। আহ! সে যে কী চিকনাই লোম! ভয়ে আরও ছোট্ট হয়ে ছিল। এইটুকু। কুঁকড়ে। সদ্য মায়ের কাছ থেকে আনা তো!
তারপর, হপ্তাখানেক পর, সে যখন বাগুইহাটি গেল, ছানাটা একটু বড় হয়েছে। কাগজ পড়ছে, এমন সময় গুটিগুটি এসে কোলে মাথা রেখে চুপ করে ঘুম। আহ! সেই চেকনাই লোমে হাত বোলাতে বোলাতে তারও তো আসছিল ঘুম, ইশশ!
সে অবশ্যি বলেনি মাকে। আগেভাগে গল্পগুলো জানা ছিল যে! নীতা জেঠিমা যেমন। খোকন জেঠু বিয়ে করে এনেছিল। একদম উঠাইকিরি ঘরের মেয়ে। নতুন কাকে গু খেলে যা হয়। টাকাকড়ি ওড়ানো চলল পুরোমাত্রায়। জামাকাপড় দামি-দামি। মুটে দিয়ে বাজার আনত। খোকন জেঠুকে বিয়ের সময় উত্তমকুমারের মতো লাগত, মায়ের কাছে শোনা। এরপর কুকুর পোষা হল। শেষমেশ সুইসাইড। খোকন জেঠু আবার বিয়ে করল। কাবেরী জেঠিমা। উকিলের জুনিয়ার ছিল সুইসাইড কেসে। ফুলঠাকুমা মারা যাবার আগে সব সম্পত্তি গৌতম জেঠুকেই দিয়ে গেলেন। আদতে অবশ্য ফুলঠাকুমা নীতা জেঠিমাকে পছন্দ করতেন না। খোকন জেঠু গৌতম জেঠুর কাছে পাঠাবার আগে নিজের দেওয়া ঘিয়ের কৌটোটা ফেরত নিয়ে নেয় ওঁর থেকে। ফুলঠাকুমার আঁতে ঘা লেগেছিল।
মেজজেঠুর বউয়ের গল্পটাও তাই-ই। অ্যাত্ত সুন্দর বউ, মেয়ে। মেয়েটা অসুখে মরল — বউটা আত্মহত্যা। নতুন মেজজেঠিমা আমুদে লোক, বাচ্চা-কাচ্চার হাঙ্গামা নেই।
সে বলেইনি কাউকে তার একটা কুকুর চাই। সে বরং অনীহাই দেখিয়েছে।
বাবা যদিও মাছ পুষত। ওতে দোষ নেই। বাবার পৈতেতে পাওয়া। কোনও ক্ষতিই হয়নি পোষার পর। হয়তো মাছেদের বোধশক্তি কম বলে। সেও পুষেছিল। মামা অ্যাকোরিয়ামটা কিনে দেয়, পৈতেতেই। তার সাথে, ওয়াশিংমেশিন। মায়ের খুব প্রিয় ছিল ওটা। হাতের তালুতে টিউমার। বেচারার কাপড় কাচতে কষ্ট হত। সেই ওয়াশিংমেশিনটা বিগড়েছে। অনেকবছর হল। মায়ের কোনও সমস্যাই হয় না।
অ্যাকোরিয়াম নিয়ে ক্রমে একগাদা বাওয়ালি হল। একদিন সবকটা মাছ মরল। তবু সেই প্রথম প্রথম কত ঝোঁক! লাল-নীল পাথর কিনবে। তারপর জলের ভেতরের সেই প্রাসাদ। গোরামি দু’টো ওখানেই থাকত। আরও কত। সোর্ডটেল, এঞ্জেল এসব। বাবা পরে গোল্ডফিশ আনে। যা-তা নোংরা করত। আর দুদিন অন্তর মরবে। ফাইটারগুলো ওদের লেজ খেয়ে নিত। একটাকে তো সে হরলিকসের জারে আলাদা করেই দেয়। পরে দেখা গেল ওইটা সেই লেজখেকোটা নয়। জারে পোরার আগে ওকে জালের ডাঁটি দিয়ে আচ্ছা করে যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছিল।
অত জল পরিষ্কার করা পোষায় না। বিরক্তিকর কাজ! অ্যাকোরিয়ামটায় এখন ক্যাসেট রাখা থাকে। সেই সব গানের। ছোটবয়সে নেশা ছিল বড়। স্কুলে যাবার টাকা জমিয়ে ক্যাসেট কেনা। হুট করে উঠে গেল। সিডি এল। তারপর কম্প্যুটার। কতগুলো ক্যাসেটের গায়ের প্ল্যাস্টিক খোলারও ফুরসৎ পাওয়া গেল না।
যতবার শালা রাস্তার নেড়িকে বিস্কুট খাইয়েছে, তখনও ভয়-ভয়। কিছু অলক্ষুনে না হয়। যা সব পুরনো কেস। মা তো পায়রাকেও চাল দিতে বারণ করত।
সঙ্গীতার যে কী শখ ছিল জীবজন্তু পোষার। বলত, আমরা বিয়ের পর কুকুর পুষব। সে যদিও তাল মেরে গেছে; বিয়ের পর বোঝানো যাবে। শেষবার তো সেই খোরগোশজোড়া দিয়েছিল ও। ভোরবেলায় গিয়ে। নরম তুলতুলে দুটো। ছেলেটা যা ছটফটে! দেখেই পছন্দ হয়ে গেছিল। আবার সস্তাও। দামটা কিন্ত অনেকটা বাড়িয়েই বলে সে। সঙ্গীতার ওইসময় চোখদুটো নরম হয়ে এসেছিল।
শেষমেশ যদিও ঘরে রাখতে পারেনি। দিদির তখন মেয়ে হয়েছে। রোগ-ভোগ হয়ে যায় যদি। কয়েকটা ছবি তুলে নিজের ছাত্রের বাড়ি সটান পাঠিয়ে দেয়।
স্বাতী বলেছিল, একবার মুরগী কিনে দিতে, পুষবে। বছর ছয়েক আগের গল্প। কয় মাস আগে বলে বসে, ওরে বাবা, সত্যি সত্যি এনে বসিস না আবার।
যাগ্গে, সে বোধ হয় হারিয়েই গেছে। বাকিরা নির্ঘাত ভাবছে সে বেমক্কা উবে গেল। এদিকে তো সে পিছন পিছন এগিয়েই চলেছে কুকুরটার। দৌড়লে, দৌড়চ্ছে। ধীর গতিতে গেলে, ধীর গতি। এভাবে হারানো সম্ভবও নয় বলতে গেলে। কুকুরটা একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা তো আর ছাড়াবে না।
Join the Discussion