A+ A-

দুঃ

ওম!
সন্ন্যাসী সুনির্মল মহারাজের ঠোঁট ফসকে শব্দ বেরোল। আরও খানিক চোখ বন্ধ রেখে তিনি আদি শব্দের গভীরতা অনুভব করার চেষ্টা করলেন। এক বিন্দু বিষণ্ণতা আর পুঞ্জীভূত প্রত্যয় তাঁর মনের শূন্য সরোবরকে পলকেই পরিপূর্ণ করে তুলল। তিনি চোখ মেলে তাকালেন। শিশুর মনের মতো নির্মল এক সকাল চাদরের মতো টানটান পাতা রয়েছে চারদিকে, সবুজ গাছপালার নকশার কারুকাজ সজীব। গতরাতে বৃষ্টির জলরঙে সব ধুলোময়লা ধুয়ে গেছে। ভেজা ভেজা ঘাস, ভেজা গাছ, পিচরাস্তার গাঢ় রঙ। গুরুমহারাজ বলতেন, ওম আদি শব্দ, ওম ধ্বনি উচ্চারণের পরে যে নীরবতা তাকে ছুঁতে পারলে অনন্তকে স্পর্শ করা যায়। এখনও অনেক সাধনার বাকি, ভাবলেন সন্ন্যাসী।
গতরাতের বৃষ্টিতে স্কুলবাড়ির দেওয়াল এখনও ভেজা। গোলাপি রঙের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো স্কুলবাড়ি, দেওয়ালে শ্বাস নিলে ব্রহ্মচর্যের আঘ্রাণ পাওয়া যায়। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি, প্রার্থনাঙ্গন — সব এই বাড়ির মধ্যেই। সন্ন্যাসীদের থাকবার জন্য আলাদা কোয়ার্টার থাকলেও সুনির্মল মহারাজ স্কুলবাড়ির একটি ঘরেই থাকেন। ছোট ঘরে একটি তক্তপোশ, তার ওপর বিছিয়ে থাকা শতরঞ্চি, তলায় একটি ছোট টিনের ট্রাঙ্ক। আলনায় গেরুয়া বসন, উত্তরীয় এবং পড়াশোনা ও লেখালিখির একটি টেবিল।
চাতাল পেরিয়ে বাগানে পা রাখলেন সন্ন্যাসী। ভালো লাগল তাঁর। এই বিদ্যাপীঠ বহু মানুষের মিলিত প্রয়াসে এক পরিপূর্ণতা পেয়েছে — আজ তা স্মরণ করার দিন এবং যে মানুষটি না থেকেও সবচেয়ে গভীর অবদান রেখে গেছেন তাঁর নাম উচ্চারণ করার দিন। প্রাণভরে নিশ্বাস নিলেন মানুষটি, মনে পড়ল অতীত দিনগুলোর কথা, ভালো পাকা স্কুলবাড়ি নেই — ঝড়বৃষ্টি হলে বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে দেওয়া হত। নবম শ্রেণির পর থেকে ল্যাবরেটারির জন্য অন্য স্কুলের শরণাপন্ন হওয়া। স্বয়ং ঠাকুর রামকৃষ্ণ মনের ভিতর সাহস দিয়েছিলেন, হয়তো তাই এত যুদ্ধ পেরিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। একসময় মনে হত অক্ষরধাম বিদ্যাপীঠ হয়তো এক চূড়ান্ত পণ্ডশ্রম হয়ে রয়ে যাবে। উদ্যোগ আছে, অর্থ নেই। স্বপ্ন আছে, উপায় নেই। আজ সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে প্রত্যক্ষ করতে করতে সন্ন্যাসীর চোখ দুটি স্নিগ্ধ হয়ে এল। তাঁকে ছুঁয়ে যাওয়া হাওয়াগুচ্ছ জেনে গেল সেই নির্মলতার সজীব ভাবনাগুলো।
সুনির্মল মহারাজ দেখলেন পিচরাস্তায় হেঁটে আসছে ব্রহ্মচারী সুতীর্থ, ছেলেটিকে দেখলে নিজেকে মাঝেমাঝে বুড়ো মনে হয় মহারাজের। বিদ্যাপীঠ থেকে সুতীর্থকে সুনির্মল মহারাজের সেবক নিযুক্ত করা হয়েছে গতমাস থেকে। প্রয়োজন নেই, তবুও। সুতীর্থর জ্ঞানপিপাসু মন, সতেজ মস্তিষ্ক। সুনির্মল মহারাজের সংস্পর্শের প্রতিটা মুহূর্ত নিংড়ে নিতে চায় সে।
পায়ে হাত ছুঁয়ে প্রণাম করল সুতীর্থ, মুখে বিনয়ের ভাব, সুতীর্থর কাঁধে সস্নেহ হাত রাখলেন মহারাজ। বিশাল প্রজ্ঞার অমলিন সান্নিধ্যে সুতীর্থর মন শ্রদ্ধায় পূর্ণ হয়ে উঠল। তাকে পাশে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মহারাজ বললেন, চলো, রবিবার অযোধ্যা পাহাড় ঘুরে আসি।
– চলুন।
– চলুন মানে? তোমার নিজস্ব মতামত কী সেটা বলো।
– আমার মতামত ? আমার সেরকম…
– ঝেড়ে কাশো হে, ঝেড়ে কাশো। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রয়োজন ছাড়া কাজ করা ঠিক নয়, বুঝলে?
– আজ্ঞে।
– কী বুঝলে?
– সেভাবে রবিবার তো কোনও কাজ নেই, তবে অযোধ্যা পাহাড় না গিয়ে জয়চণ্ডী পাহাড়ও যাওয়া যায়।
– হীরক রাজার দেশে? কাল দেখলে বুঝি ছেলেদের সঙ্গে বসে?
সুতীর্থ মাথা নামিয়ে নেয়। ব্রহ্মচর্যের ব্রতে সিনেমা সম্পর্কে আগ্রহ দেখানো বোকামির লক্ষণ। বহুবার শুনেছে জয়চণ্ডী পাহাড়ে ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার কিছু অংশ শুটিং হয়েছিল, একবার জায়গাটা দেখে আসার ইচ্ছে অনেকদিনের। সুনির্মল মহারাজ নিষ্পলক চেয়ে আছেন সুতীর্থর দিকে। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী সুযোগ পেলে তিনি এখনও দেখেন। সুতীর্থর কাঁধে অল্প চাপ দিয়ে মহারাজ বললেন, চলো জয়চণ্ডীই যাব।
একথা সেকথা বলতে বলতে বৈরাগী মানুষদুটি স্কুলবাড়ি ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে গেছিলেন, ছাত্রদের খেলার জন্য ছোট বড় মিলিয়ে একুশটা মাঠ। মাঠে কাল বৃষ্টির জন্য জল জমে আছে, জমা জলে নৌকা ভাসানোর মজাই আলাদা। মাঝেমধ্যে শিশুর জীবন আকাঙ্ক্ষা করে মানুষ। আকাশের কোণে মেঘের মৃদু সঞ্চার দেখে মহারাজ আন্দাজ করলেন আজ বৃষ্টি হবে।
– মহারাজ।
স্কুল পিওন সত্যদার ডাকে পিছন ফিরলেন তারা। সত্যদা জানালেন ছেলেরা জমায়েত। সুনির্মল মহারাজ আবার বুকভরে শ্বাস নিলেন, সুতীর্থর কাঁধে হাত রেখে বললেন, চলো। স্কুলবাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে সুতীর্থ গান ধরল, সুরের প্রসন্নতায় গাছের পাতা ঝরিয়ে দিল গতরাত থেকে জমিয়ে রেখে দেওয়া বৃষ্টির জল, খেয়ালি বাতাস ওদের টপকে দূর হস্টেলে হারিয়ে গেল, বড় চমৎকার সেই গান —

মাটির দেহ মাটিই হবে,
যেদিন পুড়ে হবি ছাই
এ দেহ তোর পচা দেহ
গরব কীসের ভাই…

* * *

– আজ তোমাদের জীবনে বিশেষ এক দিন।

কথাটা বলে থামলেন শিক্ষক সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য। সামনে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রদের উজ্জ্বল মুখের সারি। আজ তারা নিজেদের বাড়ি ফিরে যাবে। চারদিন আগেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে, তারপর দিনতিনেকের সোশ্যাল সার্ভিস ক্যাম্প। দীর্ঘ আশ্রমজীবন শেষ করে এরা পা দেবে বাইরের পৃথিবীতে, জীবনের জটিলতার পাকচক্রে পড়ে শুরু হবে আসল লড়াই। আবাসিক জীবনের শিক্ষা এদের ভিত্তি মজবুত করে দিলেও বাহ্যিক রণকৌশল কেবল প্রকৃত পরিবেশেই শেখা সম্ভব। সুনির্মল মহারাজের চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল সিদ্ধার্থবাবুর কথায়।
– একটি নদীতে অনেক মাছ ছিল। রোজ রাতে যখন আকাশে চাঁদ উঠত, সেই চাঁদের ছায়া এসে পড়ত নদীর কালো জলে। সেই ছায়া দেখে মাছগুলো ভাবত চাঁদ হয়তো তাদেরই একজন, চাঁদের ছায়ার সঙ্গে তারা সারারাত খেলা করত। তারপর যখন সকাল হত, আকাশ থেকে চাঁদ অদৃশ্য হয়ে যেত, মাছগুলোও আর তখন জলে সেই প্রতিবিম্বকে খুঁজে পেত না। এমন ঘটনা রোজ ঘটবার পরে একদিন অমাবস্যায় আর চাঁদের ছায়া এল না রাত্রিবেলা, মাছেদের ভুল ভেঙে গেল। তারা বুঝেছিল চাঁদ অনেক দূরের অন্য জগতের এক আলোকিত চরিত্র, তার ছায়া রাত্রিবেলা আসে তাদেরই একজন হয়ে তাদের খেলায় সামিল হতে, তার ওইটুকু সংস্পর্শই ওদের জীবনে আশীর্বাদ, স্বপ্নের মতো। তোমাদের অধ্যক্ষ সন্ন্যাসী সুনির্মল মহারাজ এই গল্পের চাঁদটির মতো, প্রতিটি কার্যকলাপের সঙ্গে তিনি এমন একাত্ম হয়ে থাকেন। আমরা তাঁর বিশালতাকে চিনতে ভুলে যাই, তাঁকে আমরা আমাদেরই মতো আর একজন বলে ভেবে নিই। কিন্তু তাঁর প্রকৃত বিস্তার অনেক ওপরের স্তরে, ধ্যানের জগতে, কর্মযোগের মন্ত্রে তাঁর জীবনের নির্বাহ। আজকের দিনটাকে জীবনের ক্যালেন্ডারে বিশেষ কালি দিয়ে দাগ দিয়ে রেখো তোমরা। আসুন মহারাজ, আমি আর সময় নষ্ট করব না।
সন্ন্যাসী উঠে দাঁড়ালেন, সিদ্ধার্থবাবু এখুনি যে গল্পটা বললেন সেটা কোথায় পড়েছেন কিছুতেই মনে পড়ছিল না। অল্প কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন মহারাজ, তারপর শুরু করলেন — বাড়ি যাওয়ার আগে কারোরই বক্তৃতা শুনতে ভালো লাগে না, জানি, তোমরা সবাই নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবছ কত তাড়াতাড়ি শেষ হবে।
কিছু ছেলের মুখে আলগা হাসির চিহ্ন দেখা দিল।
সন্ন্যাসী আবার শুরু করলেন — সিদ্ধার্থবাবুর মতো আমি অত সুন্দর করে গল্প বলতে পারি না, ওনার গল্পের শেষে আমি তো মোটামুটি গ্রহান্তরের এলিয়েন গোছের প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছি। তবে আজকে আমি একটা ছোট গল্প বলব, তোমরা বেশি চিন্তা কোরো না, দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে আমি আজকে আর ধৈর্যের পরীক্ষা নেব না। এই গল্পটা হয়তো তোমাদের জানা প্রয়োজন। কারণ সেটা তোমাদের আগামী জীবন, আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার আর এই স্কুলবাড়ি সবকিছুর সঙ্গেই যুক্ত। আর ভূমিকা না করে প্রসঙ্গে আসি।
আমার এক পরিচিত মানুষ বলতেন, আমাদের সকলের ভিতর অবিকল যমজ দুটো পোকা থাকে, সমদর্শন কিন্তু বিপরীত স্বভাব — সু আর দুঃ। সু পোকা আমাদের সঠিক পথে চালনা করে আর দুঃ? দুঃ আমাদের মনটাকে দূষিত করে উচিত পথে গমনের অন্তরায় হয়, পিছন দিকে টেনে রাখে। প্রতিটা মানুষের দায়িত্ব হল তার ভিতরের সঠিক পোকাটাকে চেনা, একইরকম দেখতে তো, তাই বারবার ভুল হয়ে যায়। সু-এর জায়গায় দুঃ আর দুঃ-এর জায়গায় সু। আগামী জীবনে যদি তোমরা নিজেদের ভেতরের সঠিক পোকাটাকে পুষ্টি জোগান দিয়ে যেতে পারো, জানবে তোমাদের আন্তরিক শান্তি নিশ্চিত। বাইরের পৃথিবীতেও এই দু’প্রকারের প্রবৃত্তিতে পরিচালিত মানুষই দেখবে, সঠিক মানুষকে চিনে নেওয়া, বেছে নেওয়াই বুঝবে সবথেকে কঠিন কাজ।
আজ এই যে স্কুলবাড়িতে আমরা সবাই জমায়েত হয়েছি, সেই স্কুলবাড়ি তৈরির রসদ ছিল না আমাদের। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাসঘর, ল্যাবরেটরি — সব মিলিয়ে ব্যাপক খরচাসাপেক্ষ কর্মকাণ্ড। শুরুতে যা পয়সা পাওয়া গেছিল, তাতে টেনেটুনে দশম শ্রেণি অব্দি একটা ব্যবস্থা হয়, তাও অন্য স্কুলে গিয়ে ল্যাবরেটরি, তাদের বদান্যতা, সুবিধাবাদী মানসিকতার ওপর নির্ভরশীল। একটা সময় মনে মনে আমরাও ভেঙে যাচ্ছিলাম, কীভাবে সেই বিপন্নতা অতিক্রম হয়েছিল, এটা তারই কাহিনি।
আজ থেকে প্রায় আট বছর আগে একদিন। আমি ওই বাগানের পাশে বসে আছি। এমন সময় স্থানীয় দুজন মানুষ এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের বক্তব্যে এমন এক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম, যা আমার এই সন্ন্যাস জীবনের নিঃসন্দেহে সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা। তাঁরা জানান বাংলার এক প্রচলিত নিষিদ্ধপল্লীর দুলালী নামক এক দেহপসারিনি মারা গেছেন এবং তাঁর জীবনের যাবতীয় উপার্জন তিনি দান করবার ইচ্ছাপ্রকাশ করে গেছেন অক্ষরধাম বিদ্যাপীঠের উন্নতিকল্পে। যৌবন বিগত হওয়ার পর কলকাতা ছেড়ে তিনি নাকি পুরুলিয়া সদরেই বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন, লোকদুটির একজন তাঁর বাড়িওয়ালা।

ঘরে পিন ফেললেও তার শব্দ শোনা যাবে। ছেলেদের কারও মুখে কৌতূহল, কারও মুখে সংকোচ, কারও কৌতুক, কেউ বিব্রত হয়ে মুখ নামিয়ে বসে আছে। ছেলেদের মুখোমুখি বসে থাকা শিক্ষক ও সন্ন্যাসীদের অভিব্যক্তি সতর্ক। সন্ন্যাসী গল্পের বাকিটুকু আবার শুরু করলেন, তাঁর গলার গাম্ভীর্যে দূর হয়ে গেল সীমিত মানুষদের আপাতলঘুতা।
প্রথমটায় আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। বাইরের পৃথিবীর ওই কর্কশ দিক থেকে আমরা সম্পূর্ণ বিপরীত প্রান্তে বাস করি। কিন্তু এইসব অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এক অদ্ভুত সত্যের দরজা খুলে দেয়। আমি এবং তথাগত মহারাজ সদরে দুলালীর ঘরে গেছিলাম। মহিলার ঘরে ঢুকে অবাক লেগেছিল, ছোট ঘরে একটি আড়ম্বরহীন বিছানা, এক-দুটি বাক্স, ঘরের কোণে পূজার আয়োজন, গীতা ইত্যাদি। স্থানীয় মানুষদের অনেকেই তাঁর যৌবনের পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞাত, কিন্তু তাঁর চমৎকার রান্নার হাতের প্রশংসায় প্রায় সকলেই পঞ্চমুখ। দুলালীর কলকাতা ছেড়ে আসার সময় তাঁর সঙ্গে আরও তিনটি কিশোরী পালিয়ে আসে সেই অন্ধকার পৃথিবী ছেড়ে। দুলালী তাদের কাছে মাতৃসমা, তারা এখন প্রত্যেকে কলেজে পড়ছে। নিজের জীবিকা থেকে উপার্জনের প্রায় সমস্তটাই তিনি আমাদের দান করে গেছিলেন। আমি আর তথাগত মহারাজ তাঁর দাহকার্য সম্পন্ন করেছিলাম। শ্মশানে যখন চিতা জ্বলছে, ধোঁয়ার রাশি হাওয়ায় এদিক ওদিক ভেঙে ভেঙে উড়ে যাচ্ছিল, তখন বহুদিন আগে শোনা সেই সু আর দুঃ পোকাদের গল্পটা মনে পড়ে যায়।
ভেবে দ্যাখো, এই মানুষটি সারাজীবন দুঃ-এর দ্বারা প্রভাবিত পরিবেশে নিজের জীবন কাটানোর পরেও নিজের ভেতরের সু পোকাটিকে কোনওদিন নিঃশেষ হতে দেননি। জানি না, ভাগ্যের কোন দুর্বিপাকে তাঁকে এই জীবিকায় পা রাখতে হয়েছিল। কিন্তু পাঁকে থেকেও তিনি রয়ে গেলেন পঙ্কজ মৃণাল। আমি আর বেশি কিছু বলব না। কিন্তু বুঝতেই পারছ সেই দুলালীর সেই সঞ্চিত অর্থে আমাদের স্কুলবাড়ির জন্ম। আমাদের এতদিনের স্বপ্ন, উদ্যোগ বাস্তব রূপায়িত হয়। তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের পথচলায় এই অবদানকে ভুলো না তোমরা। জীবনের যুদ্ধে যে যেমন প্রান্তেই ছড়িয়ে যাও না কেন, মনে রেখো ধ্রুব আদর্শ বলে কিছু হয় না — পরিস্থিতি যেমনই আসুক না কেন, নিজের মনের কম্পাসের দিকে খেয়াল রাখতে ভুলো না, দিকনির্দেশ নিজের মনেই পাবে।
শেষে বলি, দুলালীর এক সন্তান ছিল, একটি ছেলে। তাকে আমরা এই বিদ্যাপীঠেই আবাসিকে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। অনেক ভেবেছি তার পরিচয় আমি সর্বসমক্ষে জানাব কিনা, সেটা উচিত হবে কিনা। ভেবে দেখেছি, সম্পূর্ণ ঘটনা জানার পর তার আত্মপরিচয় তার কাছে কোনওরকম সংকোচের কারণ হবে না, বরং তার পরিচয় গোপন করাই অনুচিত হবে। আজ আমি গর্বিত দুলালীর সন্তান তোমাদের সঙ্গেই এই বিদ্যাপীঠ থেকে নিজের পড়াশোনা সফলভাবে শেষ করল, সে তোমাদেরই বন্ধু সুগত।
সম্পূর্ণ জনতার দৃষ্টি সুগত নামক ছেলেটির দিকে ঘুরে যায়। সুগত চোখ নামিয়ে নিয়েছে। সন্ন্যাসীর বক্তৃতা শেষ। হাততালির শব্দে বাকি সব কিছু ঢেকে গেছে। সুতীর্থকে কাছে ডেকে সুনির্মল মহারাজ বলেন, সুগতকে আমার ঘরে ডেকো।

স্কুলের বারান্দা ধরে নিজের ঘরের দিকে হাঁটছিলেন সন্ন্যাসী। তিনি কি এই জীবনে প্রকৃত সন্ন্যাসী হতে পেরেছেন? সব মায়ার বন্ধন কি সত্যি জয় করা যায়? জীবনের সমস্ত কথা সমস্ত সত্যি কি অবহেলায় উচ্চারণ করা সম্ভব? গুরুমহারাজের কথা মনে পড়ছে। তিনি বলতেন, মিথ্যে কথা বলাও কোন ভুল নয়, যদি সে মিথ্যে কারুর কোনও ক্ষতি না করে। কিন্তু তা বলে অকারণে মিথ্যে বোলো না। স্কুলের বাইরে কোথাও গানের প্রোগ্রাম হচ্ছে, পুরুলিয়াও এগোচ্ছে, অচেনা গান। কথাগুলো শুনতে খারাপ লাগছিল না, গায়িকার গলা শ্রুতিমধুর। সন্ন্যাসী গানটার ভিতর উত্তর খুঁজতে হারিয়ে গেলেন।

আমি শুনেছি তোমরা নাকি
এখনও স্বপ্ন দ্যাখো, এখনও গল্প লেখো, গান গাও প্রাণ ভরে;
মানুষের বাঁচামরা এখনও ভাবিয়ে তোলে
তোমাদের ভালোবাসা এখনও গোলাপে ফোটে…

* * *

মাথা নিচু করে বসে আছে সুগত। ছেলে হিসেবে বরাবরই চুপচাপ সুগত। আজ এতটা নিখাদ রূঢ় বাস্তব তার পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হয়েছে। সুগতকে সামনে দেখে সুনির্মল মহারাজের সেই মতদ্বৈধটি আবার মনে জেগে উঠল, কথাটা হয়তো তাকে একা ঘরে ডেকেও বলা যেত। মহারাজ বললেন, শোনো সুগত, তোমায় কিছু হিসেবনিকেশ বুঝে নিতে হবে, তোমার মায়ের সঞ্চয়ের পুরো পরিমাণ আমরা বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার করিনি। তোমার উচ্চশিক্ষার কথা মাথায় রেখে তার এক অংশ আমরা আগেই আলাদা করে রেখেছিলাম। এখন তোমার স্কুল শেষ, তুমি ওগুলো বুঝেশুনে নাও। সুতীর্থ তোমার সঙ্গে যাবে। আমার লেখা একটা চিঠি আমি সুতীর্থকে দিয়েছি, সেটা নিয়ে অফিসে দেখালেই হবে। যতদিন না ফলাফল বেরোচ্ছে, তুমি বিদ্যাপীঠেই থাকো। আজ ছুটির দিন, অফিস বন্ধ হয়ে যাবে। যাও, দেরি কোরো না। আমি যাই স্নানটা সেরে নি।

সুতীর্থ ব্যস্ত হয়ে বলল, আপনার খাবারটা…
হাত দিয়ে নির্দেশ করে মহারাজ বলেন, খাওয়ার কোনও তাড়া নেই, ওকে নিয়ে যাও, দেরি কোরো না!
বাথরুমে কলটা বেশ উঁচুই। তলায় বসে বেশ স্নান করা যায়। জলের মোটা ধারা ব্রহ্মতালু স্পর্শ করা মাত্রই সন্ন্যাসী চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ধকধকে আগুনের আকাশচুম্বী শিখার দৃশ্য জ্বলতে থাকল কখনও না নেভার অঙ্গীকার নিয়ে। সন্ন্যাস জীবনের মূলশিক্ষা হল স্মৃতি থেকে পূর্বাশ্রমকে মুছে ফেলা, সন্ন্যাস এক নতুন জন্ম। তবু ১৯৭১ সালের সেদিনটা স্মৃতির গভীরে এমন দগদগে যন্ত্রণার উল্কি দেগে দিয়েছে, তার পোড়া দাগ চিহ্ন রাখবে জন্মান্তরেও। ভাগ্যের দুর্বিপাক কাউকে জীবনে ধ্বংস করে দেয়, আবার কাউকে দেয় নতুন জীবন। সুনির্মল মহারাজ দ্বিতীয় প্রকারের উদাহরণ।
বাবা ছিলেন কট্টরপন্থী; স্কুলের শিক্ষক। নকশাল আন্দোলনের সেই যুগে ছাত্রদের আর তার বাবার আদর্শ খাপ খায়নি। একদিন নিশুতি রাতে কারা সব তাদের বাড়ি ঘেরাও করে। তাকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে কোথায় যেন বন্ধ রেখেছিল, বাড়ি থেকে টেনে বের করার সময় সে দেখেছিল দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে আগুন। মাঝরাস্তায় জ্ঞান হারায় সে, তখন তার বয়স ১৫। অনেক রাতে অচেনা এক বাড়িতে এক মহিলার নরম হাতের স্পর্শে জ্ঞান ফিরেছিল, তিনি হাতের দড়ির বাঁধন খুলে দেন। লুকিয়ে তার জন্য কিছু জল আর খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন মহিলা। ভীত গলায় সে জানতে চেয়েছিল, আমি কোথায়?
– চুপ! চাপা গলায় মহিলা উত্তর দেন।
– বাবা, মা… সব কোথায়?
মহিলা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। ফিসফিস করে বলেছিলেন, বড় বাজে সময় এসেছে বাপধন। বড় নোংরা সময়। মানুষ মানুষকে মেরে ফেলেছে মনগড়া কারণে, তুই পালিয়ে যা, নয়ত তোকেও…
– কিন্তু বাবা, মা, দিদি!
– সব গেছে তোর… সব গেছে… সব জ্বালিয়ে দিয়েছে… সব!
মহিলার চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছিল। কী আশ্চর্য! সে এতটুকু কাঁদতে পারেনি। তার মধ্যে সব নরম স্বভাব এক মুহূর্তে শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেছিল। সেদিন সেই মহিলার সান্ত্বনায় ও সাহায্যে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালাতে সক্ষম হয় কিশোর সুনির্মল। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে সে সব ভুলে ছুটেছিল। পাশে কোথায় নদীর জলে চাঁদের ছায়া পড়েছিল, কোথাও ধানক্ষেতে সতর্ক ইঁদুর, কোথাও সোজা টানটান ছুটে যাওয়া মালগাড়ি। সে অনবরত ছুটেছিল, ছুটেছিল, ছুটেছিল। হাওয়ার পাশ কাটিয়ে, নক্ষত্রের দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে পৃথিবীর বুকে পা ফেলে অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে ঝাঁপ দিয়েছিল একা। তারপর একসময় থমকে থাকা একটা ট্রেনে উঠে পড়েছিল সে। সেখানেই গুরুমহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ। গুরুমহারাজের পরম স্নেহ ধীরে ধীরে তার ভেতরের প্রতিশোধস্পৃহা, পরিবার হারানোর যন্ত্রণা, কঠিন প্রবৃত্তি সব নির্মূল করে দেয়। নতুন একটা জীবন, নতুন গন্তব্যের পথ হিসেবে তারপর সন্ন্যাসের পথ বেছে নেওয়া — সেই যাত্রাপথে চলতে চলতে আজ বিদ্যাপীঠ।
সেদিনের সেই মুহূর্তে মহিলার মুখের সব কথা বিশ্বাস করা ছাড়া আর তো কোনও উপায় ছিল না তার। কিন্তু একটা ছোট সাদা মিথ্যে তার জীবনকে সম্পূর্ণ অন্যখাতে বইয়ে দিয়েছিল। আগুনে জ্বলে তার উনিশ বছরের দিদি মরেনি, তাকে মেরেছিল মানুষের লোভ, মানুষের ভেতরের পশু। তার দিদিও পেয়েছিল নতুন জীবন, নিষ্ঠুর জীবনের খেয়াল — সে হয়েছে সন্ন্যাসী আর তার দিদি দুলালী! পুনর্জন্মের রকমফের!
স্নান সেরে বেরিয়ে অবাক হলেন সুনির্মল মহারাজ। সুগত তখনও বসে আছে। সুতীর্থ বলে, মহারাজ, ও বলল একবার দেখা করে যাবে আপনার সঙ্গে, তাই…
মহারাজ বলেন, আরে অফিস যে বন্ধ হয়ে যাবে।
সুগত উঠে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। শান্ত গলায় বলে, একটা কথা বলব মহারাজ।
মহারাজ স্মিত হেসে বলেন, বলো। সুতীর্থ, রেডিওটা একটু চালিয়ে দাও না।
সুগত ধীরভাবে বলে যায়, আজ আপনার কথাগুলো বড় মন ছুঁয়ে গেল। মায়ের কথা মনে পড়ছিল। মায়ের স্মৃতি খুব বেশি উজ্জ্বল নয়। কিন্তু মনে আছে, মা রাতে শুয়ে শুয়ে এই সু আর দুঃ পোকার গল্পটা বলত। মা যখন ছোট ছিল, তখন নাকি মা আর তার ভাইকে কোলে বসিয়ে আমার দাদু এই গল্পটা শোনাত। অবিকল এক গল্প।
এক নিশ্বাসে কথা শেষ করে সুগত চোখ তুলে তাকায়, শান্ত নির্লিপ্ত সটান একটা দৃষ্টি। সন্ন্যাসীর তাকিয়ে থাকতে অসুবিধা হয়, সুনির্মল মহারাজ চোখ নামিয়ে নেন মাটির দিকে।

জর্জ বিশ্বাসের জন্মদিন। সুতীর্থ রেডিওর গানের ভলিউম জোরে করে দেয়, এই গানটা তার বড় প্রিয়।

এই করেছ ভালো, নিঠুর হে,
এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো
নিঠুর হে, এই করেছ ভালো…

দেবজ্যোতি মিত্র

হাওড়ার বাসিন্দা। পেশা টেকনোলজি কন্সাল্টিং। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ ২০০৭-এ, MDI Gurgaon থেকে এম বি এ পাশ ২০১২-য়। শখ - লেখালিখি, ভ্রমণ, ফিল্ম মেকিং। কৈশোরের মৃদুমন্দ পুরুলিয়ায় সঙ্গে পরবর্তী মুক্তমনা যাদবপুরের ককটেলের প্রভাব স্বভাবে স্পষ্ট, লেখাতেও। উপন্যাস লেখার স্বপ্ন রাখেন দেবজ্যোতি।

Read Next: ঈশ্বরের সন্তান

Join the Discussion

Your email address will not be published. Required fields are marked *