A+ A-

ঝুঁকির টানে

তোমার     খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে     টুকরো করে কাছি
আমি     ডুবতে রাজি আছি আমি ডুবতে রাজি আছি॥

বুধবারের দুপুরগুলো বিকেলে গড়ায় কফি হাউসে বসে কলেজবেলার মতো সংসারবিমুখ আলোচনায়। মাথাপিছু দু’কাপ ইনফিউসন আর দল বেঁধে দু’প্লেট পকোড়া নিলে দুপুরের ফাঁকা বেলাতে কেউ চেয়ার ছাড়ার তাগাদা দেয় না। হয়তো সাহসও করে না চালশে ধরা মেয়েদের আড্ডা ভাঙতে। মণিকুন্তলা, সুমনা, দীপমালা আর রুমার আড্ডা বছর কুড়ি আগে প্রায়ই কোনও একজনের প্রেমিকটি তছনছ করে দিত। সেইসব প্রেম আজ যেন অন্য মানুষীর গল্প ওদের কাছে।

গবেষক প্রেমিকটিকে দায়মুক্ত রাখতে দীপমালা একটা বাজখাঁই প্রশাসনিক কাজ নেয়, কলেজ পেরিয়েই। তাতে প্রেমিকটি ভয়ানক হীনম্মন্যতায় ভুগে শেষকালে বিদেশে চলে যায় দীপমালাকে ছেড়ে। দীপমালাও প্রশাসন ছেড়ে সুযোগ মতো অধ্যপনায় লাগে। বুধবারটা ওর সুবিধে মতো দিন। বাকিদের রোজই কাজের দিন বা করে নিতে পারলে যে কোনওদিনই রোববার।

সুমনার অভিনেতা প্রেমিকটি কালক্রমে নামডাক করার আগেই বেতার থেকে বিজ্ঞাপনে, মঞ্চ থেকে মন্দিরে কণ্ঠস্বর বেচে সুরোজগেরে হয়ে গিয়েছিল। তাই বিয়েও সেরে ফেলেছিল চটপট। দুম করে চলে গিয়েছে নতুন সংসার পেতে, সতেরো বছরের মেয়েকে সুমনার সঙ্গে রেখে। সুমনা এখন মন্দির থেকে মঞ্চে, বিজ্ঞাপন থেকে বেতারে কণ্ঠশিল্পী। অভিনেতার রোজগার অনিয়মিত হওয়ায়, তার বাধ্যতামূলক অর্থসাহায্যটিও যে তাই।

রুমার প্রেমিক বয়স বাড়তে কর্পোরেটের হোমরা-চোমরা আর ভয়ানক অর্থপিশাচ হয়ে উঠেছে। বিবাহিত জীবনে লোকটা বর নয়, স্বামী। রুমার দিনগুলো সে ঘরের খাটনিতে আর খরচের হিসেব রাখায় নিঙড়ে নিতে চাইছিল। তাকে কলা দেখিয়ে নিজের আর তাদের বাইশ বছরের ছেলের প্রয়োজন আর শখ মেটাতে রুমা ছাত্র পড়ায় আর একটা অডিট ফার্মের হয়ে নানান ব্যবসাদারের হিসেব দেখে। তাই এদিক-সেদিক করে একটু আগে পরে হলেও বুধবারের দরবারে সে হাজির হবেই হবে।

মণিকুন্তলা বা মণির ছেলেমেয়েরা চাকরি নিয়ে প্রবাসে। মণি শুধু ঘুমোতে বাড়ি ফেরে। তাই মফস্বল থেকে সপ্তাহে সাতদিনই শহরে আসে। মিলেনিয়াম পার্কে কিংবা সায়েন্স সিটিতে চরে বেড়ায়। খবরের কাগজে ফ্রিলান্সও করে সংস্কৃতির পাতায়। তাতে ডোভার লেন থেকে এয়ারটেল নাট্যোৎসব, বইমেলা আর লিটলম্যাগ মেলা চষে ফেলে।

 

সকাল আমার গেল মিছে,           বিকেল যে যায় তারি পিছে গো –
রেখো না আর, বেঁধো না আর কূলের কাছাকাছি॥

বাপমায়ের অনেক বয়সে দুই দাদার অনেক বছর পরে মণি। মণির শৈশব থেকেই দাদারা প্রবাসে। ক্লাস নাইনে বাবা রোগশয্যা নিতে রূপক এসেছিল অঙ্ক শেখাতে। কৌতূহল, অস্থিরতার সাথে মণির জীবনে তখন বাবাকে হারানোর আশঙ্কা, উদ্বেগ। গভীর ভয়ের ওপর চড়া সাহসের মুখোশ। মণির কাঁচা বয়সের পাকা কাজে রূপক তখন অবাক, মুগ্ধও। তাই মেয়েটার পড়াশোনার দুর্বলতাতে সে সহানুভূতিশীল। মণিও বাবার অসুখে হারানো অবলম্বনটুকু পেয়েছিল রূপকে।

রূপকের বাড়ি থেকে চাপ ছিল চাকরি নেওয়ার। আর কাগজের শিরোনামে বাইশ হাজার ইঞ্জিনিয়ারের বেকারত্ব। রূপক গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। খরচ চলছিল টিউশন জুটিয়ে। মণির মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই বাবা গত হয়েছিলেন।
দাদারা পারলৌকিক কাজ মিটিয়ে ফিরেছিলেন প্রবাসে। পেনশনে মণির আর মায়ের চলে যেত। রূপকের পড়ার খরচ চালাতে মণি মেতেছিল টিউশনিতে। রূপকের দু’বছরের পাঠক্রম, পরীক্ষা হয়ে রেজাল্ট বেরোতে কালের নিয়মে ঠেকেছিল চার বছরে। নিজের বাড়িতে তখন রূপকের খাওয়া বন্ধ। মায়ের তৈরি খাবার নিয়ে মণি যেত কলেজে। রূপক তাই খেয়ে ছুটত বিশ্ববিদ্যালয়ে। উচ্চমাধ্যমিকের দোড়গোড়ায় মণি টের পেয়েছিল যে সে পরীক্ষার জন্য তৈরি নয়। মণি পাশ করেছিল পরের বছর। রূপকও। সে চাকরিও পেয়েছিল। বিয়ে করেছিল মণিকে। না গুছিয়ে গাঁটছড়া বাধাটা রূপকের বাড়িতে অপছন্দ। মণিকে পার করতে উদগ্রীব দাদারা বর্তে গিয়েছিলেন।

সংসারের শুরুতে মণি কয়লার উনুনে রান্না করত। রূপক সন্ধেবেলা আড্ডায় গেলে পড়াশোনা করত। পার্টওয়ানের পরেই রূপসা হয়েছিল। মা কাছে রেখেছিলেন। পার্টটু পরীক্ষা দিয়ে মণি ফিরেছিল রূপকের বাসায়। মল্লার হতে নাতি পেয়ে রূপকের মা এসে নিয়ে গিয়েছিলেন ওদের। মল্লার বারবার বাড়ির পাশের হাইওয়েতে বেরিয়ে যাওয়ায় রূপকের মা খুব ভয় পেতেন যে তাঁর নাতি বোধ হয় ট্রাক চাপা পড়বে।

রূপক একটা দু’কামরার ছোট্টো বাড়ি কিনেছিল। সকাল-সন্ধে বাড়িতে রূপককে ঘিরে ছাত্রের বৃত্ত যত ছড়িয়েছিল, তত স্বচ্ছন্দ হয়েছিল ওর বাবার ক্যানসারের চিকিৎসা, ছেলেমেয়ের কনভেন্ট ইস্কুলে পড়া। দিনের শেষে মণির সাথে রূপকের যোগাযোগ হত না আর। তারা কথা বলত না, শুধু কাটাকাটি করত।
রাতদিনের কিশোরী মেয়েটার সাথে রূপকের ছোঁয়াছুঁয়িগুলো মণির চোখে লাগছিল। মেয়েটির জায়গায় এসেছিল একটি বউ। ছুটির দুপুরে ছেলেমেয়েকে আঁকার ইস্কুল থেকে বাড়ি নিয়ে এসে মণি আবিষ্কার করল বউটি আর রূপক তাদের বিছানায় সোহাগে চুর।

 

মাঝির লাগি আছি জাগি সকল রাত্রিবেলা,
ঢেউগুলো যে আমায় নিয়ে করে কেবল খেলা।

ছেলেমেয়েকে নিয়ে মণি মায়ের কাছে চলে গিয়েছিল। নিজের বাড়িতে ফিরেছিল এম এ-তে দাখিল হয়ে। খরচ যোগাচ্ছিলেন মা। মণির কাছে লড়াই ছিল রূপসা আর মল্লারকে বাবার চরিত্রহীনতার সাথে যুঝতে শেখানো। নিজের ব্যয়ভার বইতে এম এ পাশ করে ঘরে বসে টিউশন করত মণি। একসময় মণি টের পেয়েছিল যে পারিবারিক ভাবমূর্তিটা রূপকের বহুমূল্য পোশাক। কোনওদিনই রূপক মণিকে বা ছেলেমেয়েদের ছেড়ে যেতে পারবে না। অথচ সেই পারিবারিক জীবনে তার আন্তরিক একনিষ্ঠাও নেই। এই দ্বৈতের সংঘাতে জেরবার হয়ে ছেলেমেয়েরা বড়ো হয়ে গেছে। রূপকের সম্পর্কগুলোর কানাকানিতে বীতশ্রদ্ধ ছেলেমেয়ে সাবালক হয়েই রূপকের পদবি ছেড়ে নিয়েছে মণিরটা।

এর মধ্যে মণি ইস্কুলে পড়িয়েছে কিছুদিন। সুমনার সঙ্গী হয়ে নানা মঞ্চে আবৃত্তি করেছে। এক কবি থেকে আরেক কবিতে পাঠ নিয়ে বোধ আর ভাবের স্রোতে ডুবে ভেসে তার কবিতারা খাতার পাতা ছুঁচ্ছিল। তারপর সম্পাদক, প্রকাশক হয়ে পৌঁছল পাঠকের কাছে। নতুন চেনাশোনা হল কিছু। কাজ জুটল অনুবাদকের, সাংস্কৃতিক সংবাদদাতার। অবকাশ শুধু বুধবার।
তবু মাঝে মধ্যেই প্রাণে দুঃখ ঘনিয়ে ওঠে। ছেলেমেয়ের দায়িত্ব সারা। তাদের সঙ্গী জুটবে কিনা, তারা সাবেকি চালে সংসার করবে কিনা, সেসব তাদের ব্যক্তিত্ব আর কালের ব্যাপার। কিন্তু মনপ্রাণ তো মুক্তি পেল না। রূপকের প্রস্টেটের কারসিনোমা। কেমোথেরাপি চলাকালীন মণি দেখল যে বাইরের আকর্ষণ না ঘুচলেও, রূপকের আশ্রয় আজও মণি। শুধু থাকার জায়গার ভাড়া বলে রূপককে সেবা দিলেও মণি জানে যে দেনাপাওনার হিসেবে রূপক একলা নয়, বসতবাড়িটার মালিকানা তারও। সব অধিকার পরিমাণ আর মূল্য দিয়ে বর্তায় না, কিছু বর্তায় অমূল্য অপরিশোধ্য পরিষেবাগুণে। এই হিসেবটা অতল, জটিল, দুর্বোধ্য। যুক্তি দিয়ে উপাস্থাপন করা যায় না, অথচ বেশ অনুধাবন করা যায়। এর থেকে নিস্তার চায় মণি।

 

ঝড়কে আমি করব মিতে,           ডরব না তার ভ্রূকুটিতে –
দাও ছেড়ে দাও, ওগো, আমি তুফান পেলে বাঁচি।

এক বুধবার কফি হাউসেই বিবস্বান এসে বলল, “আমাকে চিনতে পারছ?” মণি কিছুতেই মনে করতে পারছিল না ছেলেটা কে। চোয়াল শক্ত করে যখন বয়স্ক মহিলাকে হেনস্থা করার অভিযোগ করতে যাচ্ছিল, তখন বিবস্বানই মনে করিয়ে দিয়েছিল যে, এক গ্রীষ্মে সোনাদায় রূপকের সহকর্মী অতীশবাবুর বাড়িতে তাদের আলাপ হয়েছিল। মণির ছাত্রী আর বিবস্বানের সহপাঠী সোনালি সোনাদায় কাজ করত। ছোট্টো এলাকায় অতীশবাবুর সাথে সোনালির আলাপ ছিল। অতীশবাবুর নেমতন্ন রাখতে রূপক যখন সপরিবারে সোনাদায় তখন সোনালিও নিমন্ত্রিত ছিল এক দুপুরে। সেদিনই বিবস্বান সোনালির কাছে বেড়াতে এসেছিল। নিরুপায় সোনালি বিবস্বানের সাথেই অতীশবাবুর নেমতন্ন রেখেছিল। সব্বার ধারণা হয়েছিল যে, বিবস্বান সোনালির প্রেমিক। মণি সোনালিকে জেরা করে জেনে ফেলেছিল বিবস্বানের বিয়েটা সদ্য ভেঙেছে। সেই ট্রমা থেকে বেরোতে বিবস্বান বেড়াচ্ছে।

তিন বন্ধুর সাথে মণি বিবস্বানের আলাপ করাল। সেদিন বিবস্বান মণির সাথে হাঁটল শেয়ালদা স্টেশন অব্দি। ছেলেটার অস্থিরতা পাঁচ-সাত বছরেও কাটেনি। মণির কষ্ট হচ্ছিল ছেলেটার জন্য। তাই মণি তার সাথে পরদিন দেখা করতে রাজি হয়ে গেল।
দু-তিনদিন পরপর ঘোরাঘুরির পরে বিবস্বান বলল, “আমি যখনই সোনালির কাছে তোমার খবর জানতে চাই, ও এড়িয়ে যায়। এখন বুঝতে পারছি তোমার সাজানো সংসারের অসুখ। আমি ভাবতাম যে আমরাই পারলাম না, এখন দেখছি তোমরাও পারোনি।” এ উপলব্ধি, নেহাৎ কথার কথা নয়। এর কোনও জবাব নেই। মণির তবু দুটো সন্তানকে মানুষ করার অছিলায় কাল কেটে গেছে। বিবস্বানকে মণি বলল আবার বিয়ে করতে। বিবস্বান অপারগ। বিয়ে ভেঙে গেলেও তার প্রেমের পাত্রী বদলায়নি। পাত্রীরও এক দশা। তাই তাদের মিটমাট হয়ে গেল। আগামী বসন্তে তাদের প্রথম সন্তান আসবে।

কিন্তু রূপকের সাথে মণির সম্পর্ক আর দানা বাঁধবে না। বিশ্বাসভঙ্গ মণিকে বড়ো কাঠিন্য দিয়েছে। সে আর প্রেম টের পায় না। টের পায় পরাবলম্ব সেজে থাকার অনুশীলন থেকে মুক্তির আকাঙ্খা। এই ইচ্ছেকে মর্যাদা দিতে চায় সে। এবার শুধু নিজেকে ভালোবাসতে চায়।

তার যোগাযোগ হলো সচ্চিন্তা প্রকরণ মিশনের সাথে। মিশন দেশের মহিলাদের নানা কালে নানান সামাজিক স্তরে জীবনের যাপনের বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করে চলেছে। তারাই মণিকে বইপত্র, পথখরচ আর থাকার ব্যবস্থা করে পাঠিয়ে দিল মথুরা, বৃন্দাবনে একটা গবেষণামূলক কাজ দিয়ে। মণি ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরুদ্দেশে।

সংহিতা মুখোপাধ্যায়

উৎসাহী পাঠক এবং কৌতূহলী লেখক সংহিতা গল্প লেখেন গল্পের মতো করেই। প্রকাশিত গল্প সংকলন 'গুচ্ছ খোরাক'।

Read Next: শ্রীচ্যাটার্জির নিবৃত্তিবাসনা

Join the Discussion

Your email address will not be published. Required fields are marked *